১৯৫২ এর একুশে ফেব্রুয়ারী ছাত্রদের উপর ঐতিহাসিক হামলার একটু পরের ঘটনা। ঢাকা মেডিকেল কলেজের আশপাশে ঘুরঘুর করছিলেন ফুলহাতা হাওয়াই শার্টের ভেতরে ক্যামেরা লুকানো এক যুবক। তৎকালীন সরকারী প্রচার বিভাগের সহকারী পরিচালক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক কাজী ইদ্রিস সাহেব তড়িঘড়ি করে তার কাছে আসেন। তাকে জানান যে আন্দোলনে নিহত একজনের লাশ হাসপাতালের পেছনে রক্ষিত আছে। ডঃ হালিমা খাতুনের সহায়তায় গোপনে সেই লাশের ছবিটি তুলেন সেই যুবক, তিনিই ছিলেন ফটোগ্রাফার আমানুল হক আর ছবির সেই লাশটি ছিল শহিদ রফিক উদ্দীনের। এটিই ভাষাশহীদের একমাত্র ছবি যা কিনা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় এই ছবিটি পোস্টার করে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রচারিত হলে তিনি প্রায়ই পুলিশি হয়রানির সম্মুখীন হতেন। একারনে তিনি দেশ ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সহযোগে তার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে। সেই সম্পর্ক পরিণত হয়েছিল শক্ত বন্ধনে। সত্যজিতের বিভিন্ন পোর্ট্রেট এর মধ্যে চোখ কুঁচকে ক্যামেরার লেন্সে নিবিষ্টভাবে তাকানো ছবিটিও আমানুল হকের তোলা। সত্যজিত বলেছিলেন যে এটি তাঁর সেকেন্ড বেস্ট পোর্ট্রেট। আমানুলের জিজ্ঞাসার জবাবে জানিয়েছিলেন যে, শ্রেষ্ঠ পোর্ট্রেটটি ম্যাগনামের মার্ক রিবিউর তোলা। এ স্বীকৃতির মাহাত্ম্য যাঁরা ফটোগ্রাফার তাঁরা ভালোভাবে বুঝবেন।
প্রয়াত শওকত ওসমান এই ব্যক্তিকে অভিহিত করেছিলেন ’ছায়াশিল্প ভাস্কর’ বলে। চিরস্মরণীয় এই আলোকচিত্রশিল্পী ২০১১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। পদক গ্রহণ কালে সভামঞ্চে তিনি সরবে উচ্চারণ করেন ‘সকল মাতৃভাষার জয় হোক।’ প্রাপ্ত সোনার মেডেল ও সম্মাননা পত্র তিনি দান করে দেন মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ১৯২৫ সালে জন্ম নেয়া এই শিল্পী ৩রা এপ্রিল ২০১৩ তারিখে ধানমণ্ডি সেন্ট্রাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। আজ তাঁর প্রয়ান দিবসে আমরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। এ দেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সাথে সাথে আমানুল হকও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে।
লেখা : শাহাদা নুর তামিমা
